প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি আমাদের কি বার্তা দিলো?

সবাই ইতোমধ্যে জেনে গেছেন যে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহ-সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি করে ধরা খেয়েছে এবং জেলেও গেছে। অধমটার নাম তরিকুল ইসলাম মুমিন। ও যে অপরাধ করেছে তা নিঃসন্দেহে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেননা একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের ওপর দেশের অনেক কিছুই নির্ভর করে। স্বাভাবিক ভাবেই সে তার অপরাধের জন্য আইনগত শাস্তি ভোগ করা শুরু করেছে। তাই আমি এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতে চাই না।

তবে এ প্রেক্ষাপটে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার বলার মতো কিছু কথা আছে। এ অপরাধটা যদি বাঁশের কেল্লার অ্যাডমিন, শিবিরের ক্যাডার, ছাত্রদলের গা ঢাকা দেওয়া নেতা বা কোনো পেশাদার অপরাধী করতো তাহলে বিষয়টা এতোটা আলোচিত হতো না। কিন্তু এখন আলোচিত হচ্ছে; যার বেশ যৌক্তিক কারণও আছে। ভেবে দেখুন, ছেলেটা কে? ও বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি; যেই পদে থেকে একটু চেষ্টা করলেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পাশ সংগ্রহ করা সম্ভব, গণভবনে ঢোকা সম্ভব। এটি সহজেই অনুমান যোগ্য যে, যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থের কারণে সুযোগমতো প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি করতে পারে সে তো সুযোগ পেলে স্বার্থের কারণে প্রধানমন্ত্রীর বড় ধরণের ক্ষতি করতে পারে (আল্লাহ না করুক)। আরেকটি বিষয় হলো, আপনারা জানেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত সহকারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোনীত করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্য থেকেই। তাই মুমিন যে প্রক্রিয়ায় এতো বড় পদ বাগিয়ে নিতে পেরেছে সে প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাও কিন্তু তার জন্য অসম্ভব ছিলো না। আজ মুমিন ধরা খেয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি; কিন্তু মুমিনের মতো অনেকেই হয়তো আছে যে গণভবনে ইতোমধ্যেই অবস্থান করছে অথচ আমরা জানি না। এখন চিন্তা করুন, বঙ্গবন্ধু কন্যা কতটা নিরাপদে আছেন? আজ নথি জালিয়াতি করেছে, কাল পেছন থেকে আঘাতও তো করতে পারে। যে প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ভালোবাসে সে এমন কাজ করবেও না, এমন ব্যক্তিদের নেত্রীর পতাকাতলে আশ্রয়ও দেবে না। অথচ একজন ব্যক্তি আছে যিনি তরিকুল ইসলাম মুমিনকে নিজ হাতে পৌছে দিয়েছে এ পর্যায়ে।

হয়তে প্রশ্ন করবেন, কে সে ব্যক্তি অথবা মুমিন ছাত্রলীগের এতো বড় পদ পেলো কিভাবে? কথিত আছে, ছাত্রলীগের পদ হারানো সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ১৮ লক্ষ টাকার বিনিময়ে তরিকুল ইসলাম মুমিনকে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি পদ প্রদান করেছেন। অভিযোগটাকে একেবারে গৌণ করে না দেখারও বেশ কিছু কারণ আছে। গতকাল থেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা এ অভিযোগ তুললেও গোলাম রাব্বানী তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন নি; অথচ পান থেকে চুন খসলেই তিনি ফেসবুকে লম্বা লম্বা স্ট্যাটাস দিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেন যে কোনো ইস্যুতে। আর তার বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। এর পূর্বেও গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এসেছে, বিতর্কিতদের পদায়ন করার অভিযোগ এসেছে। যার কারণে তাকে পদ হারাতে হয়েছে। উল্লেখ্য যে,  নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া জামায়াত-শিবিরের ছড়ানো বিষবাষ্প যেমন এখনও সোনার বাংলাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তেমনি বিতারিত হওয়া গোলাম রাব্বানীর প্রডাক্টগুলো এখনও ছাত্রলীগকে কলঙ্কিত করছে প্রতিনিয়ত। উনারা ২ জন পদ হারিয়েছিলো আগেই, ৩২ জনকে তার পরে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরও থেমে নেয় আদর্শহীন প্রেতাত্মাদের ষড়যন্ত্র। এখনও কতজন অপরাধী যে এ কমিটিতে ভারী পদের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে আছে তার হিসাব হয়তো স্বয়ং গোলাম রাব্বানীও দিতে পারবে না!

শোভন ও রাব্বানী পাল্লা দিয়ে এভাবেই বিতর্কিত, আদর্শহীন ও অযোগ্যদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছে। অথচ এই কমিটিই ছিলো তাদের কাছে 'সেরাদের সেরা' ও 'চুলচেরা বিশ্লেষণে গঠিত' কমিটি। প্রবাদে আছে, যতনে রতন চেনে, শকুনে চেনে ভাগাড়। গোলাম রাব্বানী যতন হয়ে রতনকে চিনেছে নাকি শকুন হয়ে ভাগাড়কে চিনেছে তা আমি জানি না। তবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ছাত্রলীগের ধারাকে তারা 'সিন্ডিকেট' আখ্যা দিয়ে নতুন যে ধারা গড়েছিলো সে ধারারই ফসল এই তরিকুল ইসলাম মুমিন। এ দলে শুধু মুমিন একা নেই। এমন বহু জনকে কমিটিতে নিয়ে এসেছে তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এরা বের হবে বিভিন্ন সময়ে, আঘাত করবে বিভিন্নভাবে, ছাত্রলীগের ক্ষতি করবে রকমারি স্টাইলে। ১৯৭১ সালে বাংলার মা-বোনদের যেভাবে সম্ভ্রমহানী করেছিলো পাক সেনারা ঠিক সেভাবেই শোভন-রাব্বানী ও তাদের হাতে গড়া মুমিনেরা লুণ্ঠন করে চলেছে ছাত্রলীগের ঐশ্বর্য, আদর্শ ও গৌরবকে। তারা একদিকে ভয়ংকর অপরাধীদের বানিয়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা, অন্যদিকে দেশরত্ন শেখ হাসিনার একদল আদর্শিক কর্মীদের শুধুমাত্র স্বার্থের কারণে করেছে পদবঞ্চিত। যার কারণে আজ তাদের অবস্থান সিংহাসন থেকে ভাগাড়ে! 

শুনেছি, শোভন-রাব্বানির সেরা আবিষ্কার তরিকুল ইসলাম মুমিন নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও মাস্টার দা সূর্য সেন হলে থাকতো বহাল তবিয়তে। কিভাবে থাকতো কষ্ট করে সেটা চিন্তা করতে যাবেন না। যার মাথার ওপরে মনস্টাররা আছে, যে ১৮ লক্ষ টাকায় একটা পদ কিনতে পারে, যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জালিয়াতি করতে পারে তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে ডাকসুর ভিপি হওয়াও অসম্ভব নয়। আজকাল তো টাকা দিয়ে সবই হয়।

অনেক কথাই বলে ফেললাম। সবশেষে আর একটা কথাই বলতে চাই, যে যতো পারুন নিজের স্বার্থ বজায় রাখুন। কিন্তু আমাদের কাছে রেখে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারকে বিপদে ফেলেন না। তাকে নিরাপদ রাখুন; এ দেশের জন্য, আপনার জন্য, আমাদের জন্য। মনে রাখবেন, উনি আছেন বলেই আপনি আজ সম্মানিত। আর মুমিন এক এ কাজ করে নি। একদল তাকে এ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে, এক দল তার সাথে যৌথভাবে এ অপরাধ করেছে আর একদল তার পেছনের ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করছে। সবাইকে চিহ্নিত করুন, ব্যবস্থা নিন। মনে রাখবেন, সময় গেলে সাধন হবে না।

Comments

Popular posts from this blog

পদ্মা সেতু যেভাবে আমাদের আবেগে পরিণত হয়েছিলো

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নয়, চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিন