একটি মানবিক গল্প
গ্রামে যাদেরকে ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করেছি তাদের তালিকা বাবা তৈরী করেছিলো। আমি শুধু গিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছি। সেই তালিকার একজনের কাছে ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম। লোকটি তা গ্রহণ করে আমাকে ঘরে বসতে দিয়ে সেমাই খেতে দিয়েছিলো। খাওয়া শেষ করে আমি যখন উঠে আসবো তখন আমাকে বলল, "বাবা, কিছু মনে করো না, একটা কথা বলি। আমার পাশের বাড়ির (নামটি গোপন রাখলাম) ঐ লোকের পরিবারের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। আমাকে যেসব জিনিস দিলা সেখান থেকে অর্ধেক ওর বাসায় দিয়ে আসো। আমি দিলে অপমানিত হবে, তাই তুমিই দিয়ে আসো।"
আমি বেশি কিছু উনাকে বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, "আচ্ছা, উনাকেও দেবো। আপনাকে যেসব দিলাম তা আপনি রাখেন।" আমার কথা শুনে উনি খুব খুশি হলেন তা আমি বুঝতে পারলাম। তারপর উনার বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম। বাসা থেকে বের হয়ে সামান্য কিছুদূর যাওয়ার পরেই ৪-৫ জন লোক আমাকে থামালো, ওই একই লোককে সাহায্য করার কথা তারাও বললো এবং জানালো যে, তার অবস্থা আসলেই খুবই খারাপ। সে সময় হাতে ২ বস্তা ছিলো। ১ বস্তা সেই লোকটির বাসায় দেওয়ার জন্য সাথে সাথেই গেলাম, বাবাও সাথে ছিলো। উনাকে ডাকতেই বাইরে বেরিয়ে আসলো। আমরা যখন বস্তাটি তার হাতে দিতে চাইলাম তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। কিছুতেই নিতে রাজি হলেন না। না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বাবাকে বললেন, "আমার ঘরে মোটামুটি খাবার আছে আর আগামী ৩ দিন আমি একজনের বাসায় কাজ করতে পারবো। যার কারণে প্রায় ১ সপ্তাহের মতো আমি চলতে পারবো। কিন্তু এমন হয়তো অনেকে আছে যার ঘরে আজ খাবারই নেই। তাকেই বরং দাও এগুলো, শহিদুল। আমার প্রয়োজন হলে আমি তোমার কাছে চেয়ে নেবো।" এই কথাগুলো শোনার পর আমাদের আর কিছু বলার ছিলো না। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসলো। নীরবে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম।
সন্ধায় মনে হলো, পাশে কিছু লোক থাকায় উনি হয়তো লজ্জায় নিতে পারেন নি। তাই রাত প্রায় ১১.৩০ মিনিটের দিকে একটা বস্তা নিয়ে একা তার বাসায় আবার গেলাম। দরজায় নক করলাম কয়েকবার। উনি ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দিলেন। এবার আমি মোটামুটিভাবে তাকে জোড়াজুড়ি করি বস্তাটি নেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি এবারও গ্রহণ করলেন না। তিনি আবারও বিনয়ের সাথে বললেন, "আমার ঘরে মোটামুটি খাবার আছে। কিন্তু এই গ্রামে হয়তো এমন অনেকে আছে যে না খেয়ে আছে অভাবে, এই খাবারগুলো তুমি তার বাসায় পৌঁছে দাও, বাবা।" আবারও এ কথা শোনার পর আমি সত্যিই আর বলার মতো কিছু পেলাম না৷ শুধু মনে হলো, ভালো মানুষগুলো বোধ হয় এ রকমই হয়! উনার চোখের দিকে তাকালাম। আমার চোখ ভেজা-ভেজা, উনার চোখও ভেজা-ভেজা। আমার ওই মুহূর্তে উনার পা ছুঁয়ে সালাম করার ইচ্ছা হচ্ছিলো। কিন্তু আচমকা তা পারলাম না। নিঃশব্দে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলাম।
এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতাকে সংজ্ঞায়িত করার মতো শব্দ আমার অভিধানে নেই।
যতবার উনার কথা মনে পড়ছে ততবারই মনে হচ্ছে, এই মানুষগুলো এখনও আমাদের মাঝে আছে। হয়তো আমরা দেখেও দেখছি না, চিনেও চিনছি না। এমন মানুষেরা আজও সমাজে আছেন বলেই এই সমাজকে আমরা মানবিক সমাজ বলতে পারি।
Comments
Post a Comment