ছাত্রলীগের বিতর্কিত কমিটি, নগ্ন রাজনীতি ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

আজ সেই কলঙ্কিত ১৩ ই মে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নিকট অতিত ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনা ও লজ্জার দিন, ভাইয়ের হাতে বোনের রক্ত ঝড়ার দিন, লাঞ্চিত হওয়ার দিন। অথচ এই দিনটিতেই হতে পারতো ছাত্রলীগের সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রার সূচনা, এই দিনটিতেই সিন্ধু সেচে খুঁজে আনা যেতো আগামীর জন্য একঝাঁক মুজিবাদর্শের পতাকাবাহক। 

দিনটির শুরু হয়েছিলো আর দশটি দিনের মতোই সাধারণভাবে। কিন্তু তার পেছনেও একটি ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অতিত ছিলো। সেদিনের ঠিক ১ বছর আগে অর্থাৎ এখন থেকে ২ বছর আগের এই দিনটিতেই হয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন। নিয়মানুযায়ী সেই দিনের অধিবেশন থেকে ছাত্রলীগের পরবর্তী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে সেদিন শীর্ষ দুই নেতার নাম ঘোষণা করা হয় নি। কেননা বঙ্গবন্ধু কন্যা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যে, ছাত্রলীগের আগামীর নেতৃত্ব তিনিই নির্বাচন করবেন। সারা দেশ থেকে আগত লক্ষাধিক নেতা-কর্মী এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এরপর শুরু হয় নতুন নেতা নির্বাচনের নানা প্রক্রিয়া। অবশেষে রাজনীতির বিভিন্ন মারপ্যাচে জয়ী হওয়া রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ ঘোষণা করা হয়। ঘোষণাটা যেহেতু স্বয়ং দেশরত্ন শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে আসে তাই প্রশ্নাতিতভাবে নতুন দুই নেতাকে আমরা সকলে শুভেচ্ছা জানাই, মেনে নিই তাদের নেতৃত্ব; যদিও অতিতে তাদের মূল ধারার ছাত্রলীগের সাথে সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন যথেষ্টই ছিলো। 

সকলের সাদর সম্ভাষণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রথম দিন থেকেই তারা নিজেদের 'আপার ছাত্রলীগ' বলে পরিচয় দিতে শুরু করলো। পরোক্ষভাবে যার অর্থ ছিলো, অতিতের ছাত্রলীগ শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ ছিলো না! স্বার্থের দ্বন্দ দেখা দিলেই তাকে 'সিন্ডকেটের লোক' বানানোর প্রবণতা ছিলো উল্লেখযোগ্য। মূল ধারার ছাত্রলীগ থেকে ছিটকে পড়া একদল ছাত্রনেতাদের আনা হয় ছাত্রলীগের সামনের সারিতে, অপরদিকে উপেক্ষা করা হয় পূর্ববর্তী কমিটির সক্রিয় ছাত্রনেতাদের। বিভিন্ন জায়গা থেকে উপঢৌকন, কমিশন ও চাঁদা গ্রহণ হয়ে দাঁড়ায় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়াও মাদক কারবারি, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের অসম্মান করা, কর্মীদের সাথে খারাপ আচরণ ছিলো কমন অভিযোগ। তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম যে অভিযোগটা প্রকাশ্যে আসে তা হলো, দীর্ঘ দিনেও কোনো ইউনিটের সম্মেলন করতে না পারা ও নিজেদের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি উপহার না দেওয়া। এরই মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ও ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় কমিটির নামে কালক্ষেপণ আরও দীর্ঘায়িত হয়। বহু আলোচনা, সমালোচনা ও ছাত্র সমাজের দাবীর মুখে ২০১৯ সালের ১৩ ই মে সম্মেলনের এক বছর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশিত করা হয়।

ইতোপূর্বে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে বিলম্ব হওয়ার ব্যাখ্যায় তারা জানায়, গোয়ান্দা রিপোর্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে! আশ্বাস দেয়, সেরাদের সেরা ছাত্রনেতাদের নিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে। তাই তাদের আশ্বাসে সবার মনে এ বিশ্বাসটি দৃঢ় হয়েছিলো যে, তারা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরিচ্ছন্ন ছাত্রনেতাদের দিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবে। কিন্তু কমিটি প্রকাশের পরপরই প্রকাশিত হয় তাদের একচোখা রাজনীতি, দ্বন্দের প্রতিশোধ ও নিষ্ক্রিয়দের পদায়নের চিত্র। বিবাহিত, মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী, বয়স উত্তীর্ণ, হত্যা মামলার আসামী, যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামীর সন্তান, সাবেক শিবির কর্মী, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও নাবালক সহ এমন কোনো অভিযোগ ছিলো না যে অভিযোগে অভিযুক্তরা স্থান পায় নি তাদের কমিটিতে। অপর দিকে পূর্ববর্তী কমিটির অধিকাংশ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের সভাপতি-সম্পাদককে কোনো পদই দেওয়া হয় না; ৪-৫ জনকে পদ দিলেও তা ছিলো অপেক্ষাকৃত নিম্ন সারির পদ। অথচ বিগত কমিটিগুলোতে এ পদে থাকা ছাত্রনেতাদের উপরের দিকের পদগুলো দেওয়া হয়েছে; যা ছাত্রলীগের একটি কালচার। 

এ কারণে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে পদ পাওয়া ও না পাওয়া বহু নেতা-কর্মী। কমিটিতে এতজন অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে পদায়ন করার প্রতিবাদে সেদিন আমরা মিছিল করলে সে মিছিলেই হামলা করে শোভন-রাব্বানীর অনুগত কর্মীরা। এ হামলার প্রতিবাদে সন্ধার পর মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করলে সেখানে সমর্থকদের দ্বারা হামলা করানোর মাধ্যমে শোভন-রাব্বানী উন্মোচন করেন তাদের সবচেয়ে হিংস্র চেহারা, সৃষ্টি করেন শিবিরের মতো নগ্ন রাজনীতির উদাহরণ। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি ছাত্রলীগের নারী নেতৃবৃন্দও। সে হামলায় গুরুতর আহত হন রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা, ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদার ও ডাকসুর ক্রিড়া সম্পাদক সহ আর বেশ কয়েকজন। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয় মধুর ক্যান্টিনের পবিত্র প্রাঙ্গণ। শোভন-রাব্বানী তখনও ডুবে ছিলো তাদের দম্ভের সাম্রাজ্যে, ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে পুরো ঘটনাকে নিছক ছেলেখেলার মতো গুরুত্বহীন ভেবেছিলো তারা।

সেদিন ছোট্ট প্রতিবাদের মাধ্যমে যে আন্দোলনটার শুরু হয় তা অব্যহত থাকে টানা ৪২ দিন। (সে ইতিহাস বিস্তারিতভাবে অবস্থান কর্মসূচীর ১ বছর পূর্তিতে সবাই পৃথকভাবে লিখবো ইনশাআল্লাহ) আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে আমাদের সে আন্দোলন সফলভাবে সমাপ্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পতন ঘটে ছাত্রলীগের স্বৈরাচারী নেতা শোভন-রাব্বানীর। পতন ঘটলেও তাদের কলুষতা থেকে ছাত্রলীগ মুক্তি পায় নি আজও। নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া জামায়াত-শিবিরের ছড়ানো বিষবাষ্প যেমন এখনও সোনার বাংলাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তেমনি বিতারিত হওয়া গোলাম রাব্বানীর প্রডাক্টগুলো এখনও ছাত্রলীগকে কলঙ্কিত করছে প্রতিনিয়ত। ১৯৭১ সালে বাংলার মা-বোনদের যেভাবে সম্ভ্রমহানী করেছিলো পাক সেনারা ঠিক সেভাবেই শোভন-রাব্বানী ও তাদের হাতে গড়া মুমিনেরা লুণ্ঠন করে চলেছে ছাত্রলীগের ঐশ্বর্য, আদর্শ ও গৌরবকে। তারা একদিকে ভয়ংকর অপরাধীদের বানিয়েছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা, অন্যদিকে দেশরত্ন শেখ হাসিনার একদল আদর্শিক কর্মীদের শুধুমাত্র স্বার্থের কারণে করেছে পদবঞ্চিত।

এতো হাতাশার মধ্যেও আনন্দের সংবাদ হলো, আমাদের আন্দোলনকে যৌক্তিক প্রমাণিত করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সম্প্রতি ৩২ জনকে তাদের পদ থেকে অব্যহতি প্রদান করেছে। উল্লেখ্য যে, আরও ৩০-৪০ জন অব্যহতির অপেক্ষায় আছে। এ এক প্রামাণ্য ইতিহাস। ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের গৌরবের আরেকটি অধ্যায় এটি। এর মাধ্যমে সবার কাছে অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারিতা না করার যে বার্তা বঙ্গবন্ধু কন্যা পৌঁছে দিয়েছিলেন তা আজও অব্যহত আছে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ। 

শেষকথাঃ কোনো ব্যক্তিই অন্যায় করে পার পেয়ে যায় না। এর বাস্তব উদাহরণ দেখেছি গতকাল। মাত্র এক বছর আগে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক যেভাবে হামলা করেছিলো ঠিক সেভাবেই নাকি তিনি গতকাল নিজ এলাকায় হামলার শিকার হয়েছে (সূত্রঃ যুগান্তর)। এটাকেই বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ। ক্ষমতা থাকলেই মনস্টার হতে হয় না। মনে রাখা উচিত, দিনশেষে সূর্যও হারিয়ে যায়, আর শোভন-রাব্বানী তো রক্ত মাংসের মানুষ!

Comments

Popular posts from this blog

পদ্মা সেতু যেভাবে আমাদের আবেগে পরিণত হয়েছিলো

প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি আমাদের কি বার্তা দিলো?

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু নয়, চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিন