একাত্তর টিভির প্রতি বিদ্বেষ কি শুধু ধর্মীয় কারণেই?

নাস্তিকরা নাস্তিকতার নামে ইসলাম ও মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর নামে প্রতিনিয়ত কটুক্তি করে চলেছে। বাংলার ঘরে ঘরে ভারতীয় নাটকের বদৌলতে ছায়া মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; যেখানে পূজার সময় পূজা, দোলের সময় দোল অথবা ভাই ফোঁটার সময় ভাইফোঁটা উপস্থাপন করা হয় শৈল্পিকভাবে (কারও কারও মতে)। আমাদের মা-বোনেরাও তা গোগ্রাসে গিলছে। আবাসিক মাদ্রাসার হুজুরেরা প্রায়ই ছাত্র-ছাত্রীদের ভয় দেখিয়ে মেতে উঠছে বলাৎকার উৎসবে। আন্দোলনের নামে আমাদের সমাজেরই কিছু বিপথগামী তরুণ-তরুণী জনসম্মুখে চুমাচুমির প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। সমকামীতা ও লিভ টুগেদারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সমাজের একাংশ দাবী জানাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। বিয়ের শর্তে সেক্স এখন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। নামাজের জন্য মসজিদের ২ কাতারও পূরণ হয় না, অথচ এশিয়ার সর্ববৃহৎ পতিতালয় আমাদের দেশে। বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্ণ ভিউ হয় বাংলাদেশ থেকে। মাঝে মাঝেই এদেশে শুরু হয় ধর্ষণের বসন্তকাল। 

ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে এসব নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতনের চরম পর্যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ রকম সংবাদ প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমাজের বেশিরভাগ ধমপ্রাণ মানুষই এসবের সমালোচনা ও বিরোধীতা  করলেও এসব কখনওই চোখে পড়ে না ধর্ম ব্যবসায়ী শ্রেণির। চোখে পড়লেও তারা নীরবতা পালন করে বেশিরভাগ সময়ই। কারণ এতে তাদের ধর্ম ব্যবসার কোনো ফায়দা নেই। তারা শুধু খুঁজে বেড়ায় কে কোথায় ধর্ম ব্যবসার সমালোচনা করেছে, কে তাদের রোস্ট করেছে, কে তাদের ট্রোল করেছে বা কোন চ্যানেল তাদের আপত্তিকর দিকগুলো তুলে ধরেছে - এসবই তাদের ভাবনার যাবতীয় বিষয়বস্তু। তারা আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর নামে কটুক্তিকারীদের বর্জন করতে পারে না, বলাৎকারের প্রতিবাদ করতে পারে না, সমকামিতার ভয়াবহ শাস্তির কথা সমাজে তুলে ধরতে পারে না। এরা পারে শুধু হিন্দি গানের সুরে কোরআন তিলাওয়াত করতে, ওয়াজ মাহফিল থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়াতে, উদ্ভট ও গাঁজাখুরি তত্ত্ব দিতে, আষাঢ়ে গল্প শোনাতে ও মিথ্যা কথার ফুলঝুরি ছড়াতে। তাদের ভাবখানা এমন যে, আমাদের মন চাইলে আমরা বিশ্ব ইজতেমায় সংঘর্ষে জড়িয়ে ২-৪ টা লাশ ফেলে দেবো, প্রয়োজনে হাটহাজারী মাদ্রাসার মধ্যে বিপ্লব করতে গিয়ে কিছু সংখ্যক কোরআনও পোড়াবো, কিন্তু তুমি সেটা বলার কে?  যারা তাদের এসব ভন্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের নামের সাথে 'ইসলাম বিদ্বেষী ও নাস্তিক' ট্যাগ লাগানো ওদের রুটিন ওয়ার্ক। আর তা যদি কোনো মিডিয়া তুলে ধরে তাহলে সে চ্যানেল বর্জনের শুকনো ঘোষণা দিতেও তারা সিদ্ধহস্ত; যেভাবে অতিতেও পেসসি-কোকাকোলাকে বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও এই ঘোষণাটা ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ; কয়েকদিন পর নতুন ইস্যু পেলেই ধর্মীয় অনুভূতির কথা ভুলে গিয়ে তাদের বক ধর্মিক অনুসারীরা শরীক হয় নতুন ইস্যুতে।

খুব মনোযোগ দিয়ে ২ দিন ধরে লক্ষ্য করলাম, আমাদের ধর্ম ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ধর্মকে খুব সুকৌশলে ব্যবহার করছে। একাত্তর টিভির বিরুদ্ধে ওরা ইসলাম বিদ্বেষের অভিযোগ আনলেও একাত্তর টিভির অবস্থানটা মূলত ইসলাম, আলেম সমাজ বা ওয়াজের বিরুদ্ধে নয়, ওয়াজের নামে সার্কাজমের বিরুদ্ধে। এই দেশে গুটিকয়েক কাঠ মোল্লা, ধর্ম ব্যবসায়ী ও জোকারই বার বার সমালোচনা, রোস্ট ও ট্রলের শিকার হলেও অধিকাংশ আলেম ও ইসলামী চিন্তাবীদই কিন্তু সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাদের নিয়ে কখনও যেমন বিতর্কের সৃষ্টি হয় নি তেমনি তারা নিজেরাও কখনও বিতর্কের জন্ম দেয় নি। ধর্মের স্থান তাদের কাছে অনেক উর্ধ্বে, ধর্মকে তারা কখনও ব্যবসা বা পণ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনেন নি। অপরদিকে কাঠ মোল্লারা ধর্মকে ব্যবহার করেছে বার বার। কখনও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে, কখনও আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে আবার কখনও বাণিজ্যিক প্রচারের মাধ্যম হিসেবে (ওদের লেখায় ও ছবিতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করলেই নাকি সওয়াব পাওয়া যায়)। দেশের সার্বভৌমত্ব বিনষ্টের জন্য এরা সক্রিয় ও সংঘবদ্ধ হয়েছে যুগে যুগে। ১৯৫২ সালে এরা বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ফাতোয়া দিয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙনকে ইসলামের ভাঙন বলে অভিহিত করেছে। স্বার্থের কারণে এরা যেমন ধর্মকে ব্যবহার করে তেমনি বিকৃতও করে। আল কোরআনের যে আয়াত তাদের বিপক্ষে যায় ধর্ম ব্যবসায়ীরা তা কখনওই আলোচনা করে না। সমাজে আত্নহত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার, ব্যাভিচার ও ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ ক্রমশ বেড়ে চললেও তারা কখনওই যুব সমাজের কাছে এসবের কুফল ও পরিণতি তুলে ধরে না। ওদের আলোচনায় বার বার উঠে আসে বেশি বেশি ওয়াজ শোনার ফজিলত, অপরাধী গানের বিশ্লেষণ ও ইউটিউবে ওয়াজের ভিউ কম হওয়ার দুঃখ! ওয়াজের মাধ্যমে নারীর প্রতি অবমাননা, নারী বিদ্বেষ ও নারীদের ভোগ্যবস্তুর সাথে তুলনা ওদের পুরনো অভ্যাস।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এটাই আমাদের সমাজে আলেমের লেবাসধারী ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রকৃত অবস্থা। যারাই এদের ভন্ডামি ও কপটতার বিরুদ্ধে সরব হয় এরা তাদেরই থামিয়ে দেয়; কাউকে বয়কট করে, কারও কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করে দেয় বা কাউকে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে দেয়। মার্কেটে এদের ব্যাপক চাহিদা। এরা চাইলেই যে কোনো কিছু করতে পারে, কিন্তু হিলফুল ফুজুলের মতো শান্তিকামী সংগঠন তারা গড়তে পারে না। কারণ এতে মুনাফার সম্ভাবনাও নেই, ব্যবসার সুযোগও নেই। এরা গড়ে তোলে জামায়াতের মতো হিংস্র ও দেশদ্রোহী সংগঠন, হেফাজতে ইসলামের মতো চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন এবং ওলামা লীগের মতো রাজনৈতিক পদলেহনকারী সংগঠন; যা ইসলামী আদর্শ ও কোরআন-হাদিসের রোকন বাস্তবায়নের চেয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই অধিক মনোযোগী। এদের কাছে কোরআন শিক্ষার চেয়ে নিয়মিত ওয়াজ শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি জরুরি। 'বসেন বসেন, বইস্যা যান' জপতে থাকাও এদের কারও কাছে এক ধরণের আমল। ওরা ভুলে যায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের প্রাণের নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কত কষ্ট করেছেন, অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন, আঘাতে জর্জরিত হয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন; তবুও কখনও প্রতিশোধের কথা কল্পনাও করেন নি। বরং তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। স্বীয় জাতির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। মক্কা বিজয়ের পর সকলকে ক্ষমা করে যে শিক্ষা তিনি আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন তা অতুলনীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের সো কল্ড কাঠ মোল্লা ও বক ধর্মিকেরা সে শিক্ষা কতটুকু গ্রহণ করেছে? এরা সুযোগ পেলেই মেতে ওঠে প্রতিশোধের নেশায়; তা হোক মাইকে, ক্যামেরায় বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এদের ভেতরে ধর্মীয় চেতনার চেয়ে জাগতিক ঘটনার সংশ্লিষ্টতার বহিঃপ্রকাশই অধিক। এরা অহিংসা শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে হিংসা ছড়াতেই বেশি মনোযোগী। এরা মানুষের মনে সত্যের বাণী পৌঁছে দেওয়ার চেয়ে কপটতার আশ্রয়েই বেশি আশ্রিত। সমাজে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এরা কোরআন-হাদিসের আলোকে সমাধান দেওয়ার চেষ্টার চেয়ে নিজের ভাবনাশ্রিত সমাধান ও স্বপ্নে পাওয়া সূত্র প্রচারেই অধিক পারদর্শী। 

এই স্বার্থপর ধর্ম ব্যবসায়ীরা কিভাবে সমাজে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে? এরা কিভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে? এদের তো ভেতরেই মিথ্যার বাস; আর বাইরে তারই বহিঃপ্রকাশ। 



Comments

Popular posts from this blog

পদ্মা সেতু যেভাবে আমাদের আবেগে পরিণত হয়েছিলো

প্রধানমন্ত্রীর নথি জালিয়াতি আমাদের কি বার্তা দিলো?